
সারাদেশে সাংবাদিকদের ওপর বর্বরোচিত হামলা, হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা এবং দীর্ঘদিনের পেশাগত অনিশ্চয়তার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে সংবাদমাধ্যম কর্মী ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন এবং মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিসহ ১৪ দফা দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবে বিশাল সমাবেশ ও হুঁশিয়ারি
জাতীয় গণমাধ্যম সপ্তাহ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ) ও সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির যৌথ আয়োজনে এক বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বিএমএসএফ কেন্দ্রীয় সভাপতি ও ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান আহমেদ আবু জাফরের সভাপতিত্বে সমাবেশে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কয়েক হাজার সংবাদকর্মী অংশগ্রহণ করেন।
সমাবেশে সাংবাদিক নেতারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত হয়নি। উল্টো তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে দুর্নীতিবাজ চক্র। তারা অবিলম্বে সংবাদকর্মীদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।
হাবিব সরকার স্বাধীন বলেন “আমি সিগারেটও খাইনি, অথচ আমি মাদক মামলার আসামি”
খিলক্ষেত প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হাবিব সরকার স্বাধীন সমাবেশে তার প্রতি হওয়া অন্যায়ের লোমহর্ষক বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, “২০১৮ সালে বনানী থানার তৎকালীন ওসির সাজানো একটি নাটকীয় মাদক মামলায় আমাকে এখনো আদালতের বারান্দায় ঘুরতে হচ্ছে। আমি জীবনে কোনোদিন সিগারেটও ছুঁয়ে দেখিনি, অথচ আমাকে মাদকের তকমা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।”
তিনি বর্তমান রাষ্ট্রনায়ক ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, “তরুণ রাষ্ট্রনায়ক, আপনার কাছে আকুল আবেদন—অনুসন্ধানী সংবাদ করতে গিয়ে যে হাজার হাজার সাংবাদিক মিথ্যা মামলায় জর্জরিত, তাদের মুক্তি দিন। এই লাঞ্ছনা থেকে আমাদের রক্ষা করুন।”
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম
গত ১ মে চাঁপাইনবাবগঞ্জে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে মাই টিভির সাংবাদিক তারেক আজিজ এবং চ্যানেল ওয়ান ও আমার দেশের সাংবাদিক তারেক রহমানের ওপর সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে স্থানীয় সাংবাদিকরা ফুঁসে উঠেছেন। বুধবার (৬ মে) জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে অপরাধীদের গ্রেপ্তারে প্রশাসনকে ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রধান আসামিরা গ্রেপ্তার না হলে সারাদেশে সর্বাত্মক আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করেছেন সাংবাদিক নেতারা।
সাংবাদিকদের ১৪ দফা দাবি
সমাবেশ থেকে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট ১৪টি দাবি উত্থাপন করা হয়, যার মধ্যে প্রধানগুলো হলো:
মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার: ২০২৪ সালের আগস্ট পরবর্তী ও পূর্ববর্তী সময়ের সকল রাজনৈতিক ও হয়রানিমূলক মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার।
সুরক্ষা আইন: দ্রুততম সময়ে ‘সাংবাদিক সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। ওয়েজ বোর্ড: নবম ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন এবং সকল মিডিয়া হাউসে নিয়মিত বেতন নিশ্চিত করা।
তালিকাভুক্তি: পেশাদার সাংবাদিকদের তালিকা প্রণয়ন করে গেজেট প্রকাশ।
শিল্প ঘোষণা: গণমাধ্যমকে পূর্ণাঙ্গ শিল্প হিসেবে ঘোষণা করে রুটি-রুজির নিশ্চয়তা দেওয়া।
তথ্যমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি ও আগামীর পথ
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানিয়েছেন, সরকার সাংবাদিকদের সুরক্ষায় একটি ‘গণমাধ্যম কমিশন’ গঠনের কাজ শুরু করেছে। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন যে, বিনা অপরাধে কোনো সাংবাদিক কারাগারে থাকবে না এবং সংবাদকর্মীদের জন্য একটি কার্যকর ‘রোডম্যাপ’ তৈরি করা হচ্ছে।
তবে সাংবাদিক নেতারা জানিয়েছেন, কেবল প্রতিশ্রুতিতে কাজ হবে না। দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না দেখলে তারা রাজপথ ছাড়বেন না। সমাবেশ শেষে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে শুরু হয়ে রমনা পার্কে গিয়ে শেষ হয়।
















