
সাম্প্রতিক বাংলাদেশে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। কোনো সত্যতা যাচাই ছাড়াই স্রেফ গুজবের ওপর ভিত্তি করে সাধারণ মানুষকে পিটিয়ে মারার বা পঙ্গু করার ঘটনা এখন নিত্যদিনের চিত্র। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক শত্রুতার জেরে ‘ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ’ তুলে যেভাবে গণপিটুনি দেওয়া হচ্ছে, তা দেশের বিচারব্যবস্থা এবং মানবাধিকারকে এক চরম সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
সন্ধ্যা সাতটায় মাগরিবের আজানের ঠিক পরপর রাস্তায় হাঁটছিলেন ফারহান। তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চূড়ান্ত বর্ষের শিক্ষার্থী এবং গন্তব্য ছিল টিউশন। আচমকা তিন-চারজন অচেনা তরুণ এসে তাকে ঘিরে ধরে এবং চিৎকার করে দাবি করে যে, ফারহান কোনো এক মেয়েকে ধর্ষণ করেছে।
এই মিথ্যা অভিযোগ শোনার পর সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে চারপাশের শতাধিক মানুষ ফারহানকে লাঠি, রড, লাথি ও জুতো দিয়ে বেধড়ক মারতে শুরু করে। কিছু মানুষ তার কোনো কথা না শুনে মুঠোফোনে ঘটনাটি সরাসরি লাইভ-স্ট্রিমিং শুরু করে। এই লাইভ দেখে ফারহানের দুই বন্ধু দ্রুত পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে এলেও ততক্ষণে দুই ঘণ্টা দেরি হয়ে যায়। চিকিৎসকদের মতে, এই গণপিটুনির কারণে ফারহানের মস্তিষ্কে স্থায়ী ক্ষতি হয়েছে এবং তার চোখের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। মধ্যরাতে জানা যায়, ক্লাসরুমের ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে ফারহানের এক সহপাঠী এই ধর্ষণের মিথ্যা রটনা রটিয়ে তার ওপর হামলাটি করিয়েছিল। স্রেফ দুটি শব্দের উন্মাদনা—‘মব জাস্টিস’ বা ‘ওক্লোক্রেসি’ (উচ্ছৃঙ্খল জনতার শাসন) একটি সম্ভাবনাময় জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে।
আজকের বাংলাদেশের চিত্র অনেকটায় এমন। অসহিষ্ণুতা, মানসিক অস্থিরতা আর সাম্প্রতিক গণআন্দোলনের প্রভাবে মানুষ তার চারপাশের অন্য মানুষকে সহ্য করতে পারছে না। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই ধরনের উন্মাদনাকে ‘কালেক্টিভ হিস্টিরিয়া‘ বলা চলে। এই ব্যাধির পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
অনলাইনে খুব সহজেই যেকোনো গুজব ছড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে। মানুষ যাচাই না করেই মিথ্যা তথ্য বিশ্বাস করে নিচ্ছে।
আইন ও বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার কারণে মানুষের মনে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে বছরের পর বছর ধরে ধর্ষণ মামলা ঝুলে থাকা এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি হতাশা ডালপালা মেলেছে। মানুষ ধরে নিয়েছে যে স্বাভাবিক গতিতে বিচার পাওয়া যাবে না, তাই তারা ‘অন-দ্য-স্পট’ বা তাৎক্ষণিক বিচার করতে হিংস্র হয়ে উঠছে।
উচ্ছৃঙ্খল জনতার এই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা শুধু অমানবিকই নয়, এটি সম্পূর্ণ বেআইনি এবং সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী।
দেশের প্রতিটি নাগরিকের আইন অনুযায়ী আশ্রয়লাভ এবং আচরণ পাওয়ার অবিচ্ছেদ্য অধিকার রয়েছে। আইনগত ব্যবস্থা ছাড়া কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির ক্ষতি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
এই ধারা অনুযায়ী যেকোনো অভিযুক্তের (Right to be heard) বা নিজের পক্ষে লড়াই করার আইনি অধিকার রয়েছে। আদালতে দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত ফৌজদারি আইন ও জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ অনুযায়ী প্রত্যেক ব্যক্তিই নির্দোষ।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২০)। এই আইনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু এই কঠোরতার সুযোগ নিয়ে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক শত্রুতার জেরে মিথ্যা ধর্ষণের অভিযোগ তুলে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া হচ্ছে।
দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা (হত্যাকাণ্ড): আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে গণপিটুনিতে কাউকে মেরে ফেলা হলে তা দেশের প্রচলিত আইনে হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হবে, যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
মব জাস্টিসের এই সংস্কৃতি চলতে থাকলে প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে আবডালে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। লেখক আব্দুল্লাহ আল নোমান এই পরিস্থিতিকে ঈশপের সেই ‘মিথ্যাবাদী রাখাল বালকের’ গল্পের সাথে তুলনা করেছেন। বারবার মিথ্যা ধর্ষণের গল্পের বলী হয়ে যেন একসময় সত্যিকারের বিচারপ্রার্থী মানুষ বা নারীরা সমাজ ও আদালতের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা না হারান।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই নোংরা সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া জরুরি। আর কোনো সাধারণ মানুষকে যেন রাস্তায় এভাবে ফারহান বা রাহুলের মতো নির্মম পরিণতির শিকার হতে না হয়। একটি সুস্থ ও সভ্য সমাজের জন্য অবিলম্বে মব জাস্টিস বন্ধ করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি।
আবদুল্লাহ আল নোমান; ইন্টার্ন, অ্যাপ্লাইড ডেমোক্রেসি ল্যাব এবং স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী, লোক প্রশাসন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
















