
২০১৩ সাল থেকে ২০২৬ সাল দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দেশের দুর্গম ও অজপাড়াগাঁয়ের কোমলমতি শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন একদল উচ্চশিক্ষিত শিক্ষক। অথচ ২০১৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী জাতীয়করণের সব শর্ত পূরণ এবং উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে আজ অবহেলার স্তূপে পড়ে আছে দেশের প্রায় ৫ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে কোনো প্রকার বেতন-ভাতা না পেয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন এই বিদ্যালয়গুলোর প্রায় ২০ হাজার শিক্ষকের পরিবার। প্রাপ্ত নথিপত্র ও শিক্ষকদের লিখিত আবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৩ সালের ৩য় ধাপে জাতীয়করণের সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বিগত সরকার শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত অনেক যোগ্য বিদ্যালয়কে সুকৌশলে বাদ দিয়ে দেয়। এমনকি বিএনপি ও জামায়াত দলীয় শিক্ষক বা ম্যানেজিং কমিটির সদস্য এমন তকমা বা দলীয় ট্যাগ লাগিয়ে এবং নানামুখী অজুহাত দেখিয়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয়করণের তালিকা থেকে বঞ্চিত করা হয়।
বিপরীতে, অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে অনেক অযোগ্য বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ৯ জানুয়ারি ২০১৩ সালের সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী সারা দেশে প্রায় ৩১ হাজার বিদ্যালয় উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে তালিকাভুক্ত ছিল। এর মধ্যে ২৬,১৯৩টি বিদ্যালয়কে জাতীয়করণের অন্তর্ভুক্ত করা হলেও, যাচাই-বাছাই শেষ হওয়ার পরও এই ৫ হাজার বিদ্যালয়কে শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে বাদ দেওয়া হয়। অথচ ২০০৯ থেকে ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এই বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে শতভাগ সফলতা অর্জন করেছিল। সরকারি বিধি মেনেই এগুলোর অবকাঠামো ও শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল।
বঞ্চনার এই চিত্র শুধু শিক্ষকদের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়, এর শিকার হচ্ছে এই বিদ্যালয়গুলোতে অধ্যয়নরত লাখ লাখ গ্রামীণ শিশুও। দেশের অন্যান্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেখানে নিয়মিত উপবৃত্তি ও দুপুরের খাবার বা মিড-ডে মিলের (মিডফিল) মতো সরকারি সুবিধা পাচ্ছে, সেখানে এই ৫ হাজার বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশুরা সম্পূর্ণ সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত। গ্রামীণ জনপদে শিক্ষার আলো ছড়াতে এসে এই শিশুরা রাষ্ট্রের চরম বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছে।
বাস্তব চিত্র অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই বিদ্যালয়গুলোতে কর্মরত শিক্ষকদের প্রায় প্রত্যেকেই অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করা উচ্চশিক্ষিত নাগরিক। দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মজবুত ভিত গড়ার স্বপ্ন নিয়ে তারা এই পেশায় এসেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ ১৩ বছর এক টাকাও বেতন না পাওয়ায় তাদের জীবন আজ চরম সংকটে। নিজের সন্তানদের ভালো কোনো স্কুলে পড়াশোনা করানোর সামর্থ্য তাদের নেই। অর্থের অভাবে চোখের সামনে অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ন্যূনতম চিকিৎসাসেবাটুকুও দিতে পারছেন না তারা। বাধ্য হয়ে পরিবারের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দিতে এই উচ্চশিক্ষিত শিক্ষকরা বিদ্যালয়ের পাশাপাশি কেউ টিউশনি করছেন, আবার কেউবা রাস্তায় অটো রিক্সা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
দীর্ঘ এই বঞ্চনা ও অপেক্ষার প্রহরে অনেক শিক্ষকের জীবনপ্রদীপ চিরতরে নিভে গেছে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তারা নিজেদের শ্রমের কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বা আর্থিক সুবিধা দেখে যেতে পারেননি। অন্যদিকে, অনেক শিক্ষক কোনো প্রকার অবসরকালীন সুবিধা বা পেনশন ছাড়াই বিনা বেতনে চাকরি জীবন শেষ করে অবসরে চলে গেছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় কনসালটেশন কমিটি স্বাক্ষরিত পাঁচ হাজার বিদ্যালয়ের জন্য জাতীয়করণের চিঠি দেয়া হয়েছিলো। বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির ব্যানারে ভুক্তভোগী শিক্ষকরা নিজেদের অধিকার আদায়ে ২০১৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উপায়ে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে আসছেন। তাদের প্রধান দাবি ২০১৩ সালের গেজেট মূলে ২৭/০৫/২০১২ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে প্রতিষ্ঠিত, জমি দলিলকৃত এবং চলমান এই অনধিক ৫০০০ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে দ্রুত জাতীয়করণের আওতায় আনা হোক।
বিগত সরকারের তৈরি করা রাজনৈতিক বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে, দেশের শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং এই বিশাল উচ্চশিক্ষিত শিক্ষক সমাজের মানবিক অধিকার রক্ষার্থে বর্তমান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান আমাদের দাবি গুলো মেনে নেয়ার আকুল আবেদন যাচ্ছি।
সাদ্দাম হোসেন রুহান মন্ডল, যুগ্ম মহা-সচিব, বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি, কেন্দ্রীয় কমিটি।














